ওয়েবপেজ এর বিভ্রান্তিকর গঠন কি ভাবে আপনাকে প্ররোচিত করে পেজস্রষ্টার পূর্বনির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করতে

সাম্প্রতিক কালে কোনো ওয়েবসাইট এর পাঠানো সাবস্ক্রিপশন এর অনুরোধ মনে করে দেখুন।সহজ "হ্যাঁ" বা "না" উত্তর না চেয়ে, আপনাকে এইরকম কিছু দেখানো হয়ে থাকে:

The Button Bully

এই ক্ষেত্রে আপনার কাছে বিকল্প হিসেবে "হ্যাঁ" বলাটা "না" বলার থেকেঅনেক বেশি আকর্ষণীয়।এই পদ্ধতিকে "কনফার্মেশন শেমিং" বলা হয়।এটাকে "বাটনবুলি" নামও দেয়া যায় –এমন একটা বাটন, বা অপশন, যেটা আপনাকে অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার জন্যেই সৃষ্ট, যার কাজ আপনাকে "বুলি" করা, অর্থাৎ হুমকি দিয়ে, ধমকিয়ে, আপনাকে "হ্যাঁ" এর বিকল্প নির্বাচন করানো।

আর একটা উদাহরণ নেয়া যাক। কোনো ওয়েবসাইট বা অ্যাপলোড হবার সময় অনেক সময়ই আমরা এই ধরণের প্রগ্রেসবার দেখতে পাই:

The Road to Nowhere

আপনি দেখলেন ধীরে ধীরে প্রগ্রেসবার বাড়ছে, অর্থাৎ ওয়েবসাইট বা অ্যাপটা লোড হচ্ছে – কিন্তু হঠাৎ, প্রগ্রেসবার ভরে যাবার পর, আবার প্রথম থেকে শুরু হয়ে গেলো।এটা কে বলা হয় "ফেক প্রগ্রেসবার" – আমরা এটাকে বলতে পারি "রোড টু নোহোয়ের” বা"গন্তব্যহীন পথ" ।এই ধরণের প্রগ্রেসবার শুধুমাত্র একটা অ্যানিমেশন – কখনো এটাকে ব্যবহার করা হয় ওয়েবসাইট এর ধীর গতি আড়াল করতে, কখনো আপনাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে বিলম্বিত করতে, কখনো বা আপনার মত পাল্টানোর উদ্দেশ্যে।

"বাটন বুলি” আর" রোড টু নোহোয়ের” মাত্র দুটো উদাহরণ ইন্টারনেট এ অবলম্বিত বৃহত্তর কিছু অসৎ কৌশলের,যাদের নাম দেয়া হয়েছে "ডার্ক প্যাটার্ন্স"

"ডার্কপ্যাটার্ন্স" এর মূল উদ্দেশ্য জনগণকে প্রলুব্ধ বা উত্তেজিত করে কোনো সাইট এ রেজিস্টার করানো, বা কোনো প্রোডাক্ট বিক্রয়, বা বাড়তি ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে বাধ্য করা।

প্রলোভন

অনেক ওয়েব সম্প্রদায় আছে যারা "ডার্ক প্যাটার্ন্স" খোজে এবং সেই তথ্য সকলের মধ্যে প্রচার করেI আপনি যদি এই ব্যাপারে আরো জানতে চান, তাহলে এই ইনফরমেশনাল ভিডিও টা এখানে. দেখতে পারেন।

প্রলোভন

প্রযুক্তি ভিত্তিক প্ৰতিষ্ঠান বা "টেক কোম্পানি" রা ক্রমবর্ধমান চেষ্টা চালাচ্ছে "ডার্কপ্যাটার্ন্স" ব্যবহার করে আমাদের পছন্দ অপছন্দের ওপর প্রভাব ফেলতে। মাঝে মধ্যে তাদের চালাকিগুলো ধরে ফেলা গেলেও, বেশিরভাগ সময়েই কিন্তু এগুলো আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়।

একটা সূক্ষ্ণ উদাহরণ দেখা যাক – ধরে নিন আপনি কোনো হোটেল অনলাইন বুক করার চেষ্টা করছেন।লাল রঙের হরফে একাধিক বার দেখানো হলো "ইন হাই ডিমান্ড!" এবং সাথে এটাও যে উপরোক্ত হোটেলটি গত একদিন এ অনেকবার বুক করা হয়েছে।অর্থাৎ, আপনাকে বলা হচ্ছে, ঝক্কি এড়াতে হলে আপনি যথাশীঘ্র একটা রুম ভাড়া করে নিশ্চিন্ত হয়ে যান।আপনার সাহায্যার্থে সাইটটি আরো তথ্য দেয় এরপর – এটাই শেষ প্রাপ্তব্য ঘর, এবং আরো তিনজন একইসাথে এই ঘরটা বুক করতে চেষ্টা করছে।

FOMO

কি মনে হয় এই সব ক্ষেত্রে? হৃৎস্পন্দন বাড়তে শুরু করে, মনে হয় এই মুহূর্তে কাজটা করে ফেলতে হবে, নিজের অজান্তেই ক্রেডিট কার্ড গুটিগুটি বেরিয়ে আসে ওয়ালেট থেকে।এটা একটা আদর্শ দৃষ্টান্ত একরকমের "ডার্ক প্যাটার্ন" এর, যাকে বলা হয় "FOMO " – ফিয়ার অফ মিসিং আউট, অর্থাৎ কোনো কিছু হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয়।

টেক কোম্পানির এই কৌশল গুলো খুবই কার্যকরী আর সেই জন্যেই এগুলো বহুলব্যবহৃত - আমরা ক্লিক করি, সাবস্ক্রাইব করি, এবং বেশিরভাগ সময়ই সেই সব জিনিষ বা সেবার জন্য ব্যয় করে ফেলি যেগুলোর আমাদের কোনো দরকার নেই।অনলাইন সাইট গুলোর আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা এই নিগূঢ় চাতুরির জাল কেটে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের আরো অবগত এবং সচেতন হতে হবে।

ডার্ক প্যাটার্ন এর ব্যাপারে সচেতনতা আপনাকে সাহায্য করবে অবিলম্বে এগুলোকে চিনে ফেলে অনেক সতর্ক হয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে।যে কারণে স্প্যাম বা ফিশিং মেল থেকে আপনি দূরে থাকেন, সেই একই কারণে আপনি ডার্ক প্যাটার্ন এর ফাঁদেও পা দেবেন না।

দেখুন কি ভাবে লিংকডইন ডার্ক প্যাটার্ন ব্যবহার করে আপনার সম্পূর্ণ কন্টাক্ট লিস্ট ইম্পোর্ট করে নেয়।

কোন ডার্ক প্যাটার্ন?

এখন অবধি আমরা দেখলাম যে টেক কোম্পানিগুলো নানা রকমের কপট কৌশল অবলম্বন করে কি ভাবে আপনাকে দিয়ে ক্লিক করিয়ে নেয়, বা তাদের ওয়েবসাইট এ আটকে রেখে আপনাকে কিছু কিনতে বাধ্য করে।তিন শ্রেণীর ডার্ক প্যাটার্ন নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি -"রোড টু নোহোয়ের”, "বাটন বুলি" আর "ফোমো"। এবার দেখা যাক আপনি এদেরকে আলাদা করে চিনতে পারেন কিনা।

আপনি কি প্রতিটা ডার্ক প্যাটার্ন এর নাম বলতেপারবেন?

আপনি ফ্লাইট খুঁজছেন, এবং যে পেজটা লোড হচ্ছে, সেটাতে একটা রঙিন এনিমেটেড বৃত্ত দেখা যাচ্ছে, যেটা মনে হচ্ছে যে ঘুরছে।এটা কিসের উদাহরণ?

ফোমো

দ রোড টু নোওহের

আপনি একটা বিজ্ঞাপন দেখতে পেলেন যেটা আপনাকে কোনো সংস্থার নিজস্ব নিউজলেটার এর সদস্যতা নিতে বলছে।দুটো বিকল্প দেয়া হয়েছে: “হ্যাঁ, আমি আরো দক্ষতার সাথে কাজ করতে চাই” আর “আমি সময় নষ্ট করতে ভালোবাসি” ।এটা কিসের উদাহরণ?

বাটন বুলি

জাল বিজ্ঞাপন

আপনি অনলাইন শপিং করার সময় একটা মেসেজ দেখতে পেলেন “তাড়াতাড়ি করুন, এই দামএ আর মাত্র ৬টা পিস বাকি আছে !” এটা কোন ডার্ক প্যাটার্ন?

কূট প্রশ্ন

ফোমো

আপনি একটা ওয়েবসাইটএ কোনো একটা সফটওয়্যার এর ডাউনলোড লিংক খুঁজছেন। “এখনই ডাউনলোড করুন” লেখা একটা বড় বাটন ক্লিক করার পর আপনি বুঝতে পারলেন যে ওটা অন্য কোনো প্রোডাক্ট ডাউনলোড এর বিজ্ঞাপন। এটা কে কি বলা হয়?

রোড টু নোওহের

জাল বিজ্ঞাপন

একটা ফর্ম ভরার সময় আপনি অসঙ্গতিপূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর বিকল্প দেখতে পেলেন, যেমন “আমাকে প্রোডাক্ট আর অফার এর বিবরণ পাঠাবেন না” আর তার সাথেই “আমাকে প্রোডাক্ট আর অফার এর বিবরণ পাঠান”। এটা কিসের উদাহরণ?

কূট প্রশ্ন

বাটন বুলি

You can learn about more types of dark patterns here.

আমি কি ভাবে সাহায্য করতে পারি?

আপনি হয়তো ভাবছেন এই ব্যাপারে আপনার করণীয় কি।সত্যি কথা হলো টেক কোম্পানিরই এই ডার্ক প্যাটার্ন এর স্রষ্টা এবং তাদেরই দায়িত্ত এই অন্যায় পদ্ধতি গুলিতে পরিবর্তন আনা।আমেরিকা এবং ইংল্যান্ড এ ডার্ক প্যাটার্নের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আইনপ্রণয়ন এর কথা ভাবা হচ্ছে।তবে আপনিও কিছু সহজ উপায় অবলম্বন করে নিজেকে এবং আপনজনেদের ডার্ক প্যাটার্ন এর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।

১. ডার্ক প্যাটার্ন্স চিনতে শিখুন

আপনার প্রথম কাজ হলো ডার্ক প্যাটার্ন এর ব্যাপারে সচেতন হওয়া।বিভিন্ন ধরণের ডার্ক প্যাটার্ন এর ব্যাপারে এখানে পড়ুন। টুইটার ফিড বা হ্যাশট্যাগ অনুসরণ করে সাম্প্রতিক প্রতারণা কৌশল আর অভিসন্ধি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করুন।যা জানতে পারছেন অন্যদের ও জানান।

২. স্ক্রিন শট নিয়ে শেয়ার করুন

যখনই ডার্ক প্যাটার্ন দেখতে পাবেন, একটা স্ক্রিনশট নিয়ে আপনার গ্রূপ বা কমিউনিটি (সম্প্রদায়) তে শেয়ার করুন (অবশ্যই ব্যক্তিগত বিবরণ বাদ দিয়ে) । যদি এই তথ্যটি আপনি সোশ্যাল মিডিয়াতে দিতে চাইছেন, তাহলে হ্যাশট্যাগ #darkpattern ব্যবহার করুন, যাতে অন্যরা আপনার পোস্ট সহজেই খুঁজে পান এবং আপনার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে পারেন।

স্ক্রিনশট নেবার পদ্ধতি আপনার ডিভাইস বা অপারেটিং সিস্টেম অনুযায়ী পৃথক রকমের হতে পারে, যেমন কিছু মডেল এর ফোন এ তিন আঙ্গুল দিয়ে নিচের দিকে সোয়াইপ করে স্ক্রিনশট নেয়া যায় -ডাকডাকগো বা অন্য সার্চইঞ্জিন এ সঠিক কম্যান্ড খুঁজে নিন।

৩. নিশ্চিত করুন যে আপনার মতামত সম্পর্কিত কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাচ্ছে

স্ক্রিনশট নিয়ে শেয়ার করার মতো সহজ কাজ শুধু আপনার আপনজনেদের সচেতন তোলেনা, টেক কোম্পানি গুলোর সাথে একটা ফলপ্রসূ আলোচনার রাস্তা ও খুলে দেয়।ইমেইল পাঠান, টুইট করুন, টেক কোম্পানিগুলো কে জানান যে তাদের কার্যকলাপ এর ব্যাপারে আপনি অবগত এবং আপনি সেটা পছন্দ করছেন না।ভুলভ্রান্তি সম্বন্ধে সচেতন করে দিলে কোম্পানিরা নিজেই হয়তো সেগুলো শুধরে নেয়ার উদ্যোগ নেবে।

৪. প্রতি মুহূর্তে সজাগ থাকুন

ইন্টারনেটে অনেক রকমের ডার্ক প্যাটার্ন আছে, এবং নিত্যনতুন কলাকৌশল প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে।এই ছলচাতুরি থেকে বাঁচার একটা ভালো উপায় হলো ভেবে চিন্তে, ধীরে সুস্থে কাজ করার অভ্যাস গঠন করা।এক ধাপ পেছনে এসে ভালো করে বিচার করুন – যখন ওয়েবপেজ আপনাকে কাউন্টডাউন ঘড়ি দেখিয়ে তাড়া দিচ্ছে কিছু কেনার জন্য, নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, "এটা কি সত্যিই জরুরি?"... ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বে ও যদি আপনি কোনো একটা বাটন ক্লিক করে ফেলে থাকেন, লক্ষ্য করুন ডিসাইনার কী শব্দ বারংব্যবহার করেছিলেন আপনাকে প্রলুব্ধ করতে।পরিবার আর বন্ধুদের সাথে আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, যাতে তারাও এর থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

৫. আপনার ট্যাপ দিয়ে মত দিন

আপনি নিয়মিত যে ওয়েবসাইটে যান, সেখানে যদি এইরকম অসৎ কৌশলের প্রাচুর্য আপনাকে বিব্রত করে, আর আপনার মনে হয় যে আপনি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পরেও সেটাকে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না, আপনার কাছে একটা মোক্ষম অস্ত্র আছে – অন্য ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।আপনি ওয়েবসাইট এর ব্যাপারে অসন্তোষ জ্ঞাপন করে যদি সেখানে যাওয়া বন্ধ করে দেন, সেটা নজরে পড়বে। ইন্টারনেট ব্যবহার এ আরো বিশেষজ্ঞান অর্জন করতে ফেক নিউজস ম্বন্ধিত এই প্রবন্ধটি পড়ুন!